জাসদ এবং সাম্রাজ্যবাদ : জাসদের মূল সংকট
II ১ II
(ক)
জাসদ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চরিত্র এবং পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামের সাথে তার সঠিক আন্তঃসম্পর্ক কি করে বুঝবে, কারণ কে যে সাম্রাজ্যবাদ, সে সম্বন্ধেই তো সে এখনও মনস্থির (!) করে উঠতে পারেনি!
১৯৭৪ সালে তারা যে ‘থিসিস’ প্রকাশ করেছিলেন, তার শুরু হয়েছিল ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি’ আলোচনার মধ্য দিয়ে। সেখানে বেশ কৃতিত্বের (!) সাথে আবিষ্কার করা হয়েছিল যে, “ষাটের দশক থেকে আধিপত্য স্থাপনের প্রতিযোগিতায় সংশোধনবাদীদের নেতৃত্বে রাশিয়ার অবতরণ বিশ্বসংকটের চরিত্রে এক ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে। সমাজবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের বিরোধ এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের নিজেদের মধ্যেকার বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুই বৃহৎ শক্তি রাশিয়া ও আমেরিকার আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।” [খসড়া থিসিস, পৃ. ৫][১]
সুতরাং দুনিয়াটা হয়ে গেছে তিন ভাগ : “সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশোধনবাদী ও আধিপত্যবাদী রাশিয়াকে নিয়ে গড়ে উঠেছে প্রথম দুনিয়া। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে নিয়ে তৈরী হয়েছে দ্বিতীয় দুনিয়া।[২](আর) এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো তৃতীয় দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত”। [ঐ, পৃ. ১]
এই ধরনের ‘বিশৃঙ্খলা’ পূর্ণ পরিস্থিতিতে একমাত্র উদ্ধার হলো চীন; কেননা, “সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক[৩]এবং মুক্তিকামী দেশসমূহের পক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত গণচীন। চীন একটি বৃহৎ শক্তি নয়, কারণ সে অন্যান্য দেশে আগ্রাসন, হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রণ, অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপ, লুণ্ঠন, শোষণ এবং আধিপত্য কায়েম করার অপচেষ্টায় লিপ্ত নয়।[৪]চীন নির্ভেজাল (!) মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং মাও সেতুং-এর চিন্তাধারাকে[৫]ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ ও অনুশীলন করে, সকল দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব অর্জন ও রক্ষার সংগ্রামে।[৬]জাতীয় ইকনমির উন্নয়ন ও বিকাশের সংগ্রামে এবং সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামে দৃঢ় সমর্থন জানায়।” [ঐ, পৃ. ৭-৮]
সুতরাং আর দ্বিধা কি! নিঃসন্দেহে “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জনসাধারণকে অবশ্যই (সংশোধনবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে—লেখক) এ সংগ্রামে শরীক হতে হবে। তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে খাঁটি সমাজতান্ত্রিক শক্তিসমূহের সঙ্গে, সংগ্রাম করতে হবে সংশোধনবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের বাংলাদেশীয় দালালদের বিরুদ্ধে। কেবলমাত্র এ পথেই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সর্বাত্মক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব।” [ঐ, পৃ. ৮]
যেমন কথা, তেমন কাজ। এইসব ‘সারগর্ভ’ থিসিসে সমৃদ্ধ হয়ে জাসদের শেখ মুজিব উৎখাতের সংগ্রামটা আরও বেগবান হয়ে ওঠে; কেননা এই সরকার হলো, “প্রতিক্রিয়াশীল এবং ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি” এবং “তাঁর নিজের (অর্থাৎ শেখ মুজিবের—লেখক) এবং অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের তীর্থস্থান হচ্ছে আমেরিকা। (আর) আমেরিকা সমাজতন্ত্রের সর্ব প্ৰধান শত্ৰু। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও আমলারা সর্বাত্মকভাবে এ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র অচল।” [ঐ পৃ. ১১]
(খ)
কিন্তু কেন জানি শেখ মুজিব সম্পর্কে খোদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিজের মূল্যায়নটা ঠিক এ রকম ছিল না। এবং তা কি রকম ছিল তার প্রমাণ সে দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট সপরিবারে তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁর সরকারের উচ্ছেদ ঘটিয়ে।
এ ব্যাপারে শহীদ কর্ণেল তাহেরের ভাষ্যটা নিম্নরূপ :
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট অফিসারদের একটা দল এবং সেনাবাহিনীর একটা অংশ কর্তৃক শেখ মুজিব নিহত হন। ঐ দিন ভোর বেলায় দ্বিতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর একজন অফিসার আমাকে টেলিফোন করে এবং তার কথামতো মেজর রশীদের কাছ থেকে আসা একটা সংবাদ জানায়। সে আমাকে বাংলাদেশ বেতারে যেতে বলে। সে আমাকে শেখ মুজিব হত্যার খবরটাও জানায়।
আমি রেডিও খুলে জানতে পারলাম যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করেছে। আমার জন্য খবরটা ছিল মর্মান্তিক। আমি ভেবেছিলাম যে, এতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে এবং
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments